শনিবার , ২৩শে অক্টোবর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ || ৭ই কার্তিক, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

রোজিনা নয় জাতির বিবেক আজ বন্দীশালায়

 

মোল্লা তানিয়া ইসলাম তমা ( ক্ষুদে সংবাদ কর্মী ) 

করোনা অতিমারির কারণে ঘরবন্দী সকল মানুষ টেলিভিশন, পত্র-পত্রিকা, অনলাইন ভিত্তিক সংবাদ মাধ্যমসহ সোশ্যাল মিডিয়ার প্রতি অনেকটাই নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে । একদিন খবর দেখা না হলে ঐ দিনকার ঘটে যাওয়া ঘটনা প্রবাহের সঙ্গে আমাদের থাকতে হয় অসম্পর্কিত । সমাজে ঘটে যাওয়া যে কোন খবর আমাদের মনের অবস্থারও সঞ্চার ঘটায় ।

গত ১৭ই মে বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমের দ্বারা জানতে পারলাম প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক রোজিনা ইসলামকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একটি কক্ষে প্রায় ছয় ঘণ্টা আটকে রেখে হেনস্তা ও নির্যাতন করা হয়েছে । পরিশেষে তাকে পুলিশে সোপর্দ করা হয়েছে । এই ঘটনার কথা শুনে প্রথমে নিজের চোখ–কানকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না । তার পর বিভিন্ন মাধ্যমে জানলাম সেই একই অবিশ্বাস্য খবর । ঐ মুহূর্তে কোনো রকম প্রতিক্রিয়া দেখাবার শক্তিও যেন কেউ কেড়ে নিয়েছিল আমার ।

একটি স্বাধীন সার্বভৌম সভ্য সমাজে এমন ঘটনাও ঘটতে পারে? অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত একজন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক তিনি । যিনি পেশাগত জীবনে অত্যন্ত কৃতিত্বের সঙ্গে কাজ করার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জন করেছেন । তিনি সাধারণ মানুষ, সমাজ, রাষ্ট্র, দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান এবং ব্যক্তিদের সচেতন ও সক্রিয় রাখতে নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করার বহু নিদর্শন রেখেছেন এবং সে জন্য দেশে-বিদেশে সম্মানও অর্জন করেছেন ।

তাঁর দায়িত্ব পালনের লক্ষ্যে সরকারি কার্যালয়ে সরকারি চাকরিরত ব্যক্তিদের হাতে কদর্যভাবে শারীরিক ও মানসিক লাঞ্ছনার শিকার হয়েছেন । বিভিন্ন গণমাধ্যমে এই ঘটনার যে ছবি বা ফুটেজ এসেছে, তাতে করে ওই মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা যে সাধারণ নাগরিকের করের পয়সায় জনসেবার দায়িত্ব পালনের জন্য নিযুক্ত হয়ে সচিবালয়ে অধিষ্ঠান করেন, সেটা প্রতিফলিত না হয়ে বরং তাঁদের আচরণ পাড়ার অপরাধপ্রবণ দুষ্কৃতকারীদের কথাই মনে করিয়ে দিচ্ছিল । সচিবালয়ের কর্মকর্তাদের বেপরোয়া প্রতিক্রিয়া বরং এ সন্দেহকেই জোরদার করল । আমার বিশ্বাস যা কিছু তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে, সেগুলো সত্যই হবে । রোজিনার সঙ্গে যা করা হলো, তাতে সব শিষ্টতা, ভদ্রতা ও মানুষের ন্যূনতম মর্যাদার যে বোধ নিয়ে আমরা বেড়ে উঠি, আমার দৃষ্টিতে তার সব কটিরই চরম লঙ্ঘন ঘটেছে । মানবাধিকারের মতো সূক্ষ্ম বিষয় নিয়ে না ভাবলাম।

আমি ক্ষুব্ধ হয়েছি, সেই সাথে তীব্র ঘৃণা বোধ করেছি, তারপর লজ্জিত হয়েছি—কিছু বলেই এই ন্যক্কারজনক ঘটনায় মনের অবস্থা বোঝাতে পারবোনা আমরা । রোজিনাকে দীর্ঘক্ষণ বেআইনি এবং অনৈতিকভাবে আটকে রেখে পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হয়েছে । তাঁর বিরুদ্ধে নানা ধারায় মামলা করা হয়েছে । রোজিনা কারাবন্দী আছেন । রোজিনাকে তস্করবৃত্তি, হত্যা, কাউকে অপহরণ বা অপবাহন অথবা অন্য কোনো অপরাধের জন্য বন্দী করা হয়নি । আমরা সবাই পরিষ্কারভাবে জানি, তিনি ইদানীং একটি মন্ত্রণালয়ের ভেতরের দুর্নীতি, অসংগতি, অদক্ষতা নিয়ে ধারাবাহিকভাবে লিখে যাচ্ছিলেন ।

এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে তাঁর প্রতিটি লেখা জনস্বার্থে নিবেদিত—নিঃসন্দেহে সাধারণ জনগণের কাছে একজন সাংবাদিকের অঙ্গীকারের নৈতিক তাগিদ প্রসূত । করোনা অতিমারির সময়ে এই মন্ত্রণালয়ের নীতিনিষ্ঠ, দক্ষ এবং চৌকস কর্মকাণ্ড অতীব গুরুত্ব বহন করে। এর ব্যত্যয় অসংখ্য মানুষকে বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিতে পারে ।

সরকারের পক্ষ থেকে বিশেষজ্ঞ বিজ্ঞানী ও উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যবৃন্দ, যাঁরা টিকা ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে নিয়োজিত আছেন, রোগীদের কাছাকাছি থাকা চিকিৎসক, সর্বোপরি প্রধানমন্ত্রী প্রাণপণ চেষ্টা করে চলেছেন এই ভয়ংকর ভাইরাসের হাত থেকে সবাইকে রক্ষা করতে। সেই পরিপ্রেক্ষিতে বিভিন্ন সময়ে এই বিরাট কর্মযজ্ঞের সঙ্গে সবচেয়ে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত মন্ত্রণালয়ের যেকোনো দুর্নীতি, অদক্ষতা, অজ্ঞতা, অবহেলা, উদাসীনতা এমন মাত্রার অন্যায়, যা ক্ষমার অযোগ্য। রোজিনা এবং তাঁর মতো অনুসন্ধানী সাংবাদিকেরা তাঁদের নৈতিক, সাংবিধানিক ও পেশাগত দায়বদ্ধতার কারণে সেই অন্যায় জনস্বার্থে সর্বসমক্ষে তুলে ধরেন, যাতে করে তারা সংশোধন হতে পারে । আমি দৃঢ়ভাবে বলতে চাই, রোজিনাদের কোনো ব্যক্তিস্বার্থ নেই ।

রোজিনারা জাতির বিবেক হিসেবে কাজ করেন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে । তাঁর সঙ্গে অসভ্য আচরণ, হেনস্তা ও আহত করা প্রকৃতপক্ষে জাতির বিবেককে আক্রমণ করা । নাগরিকের মৌলিক সাংবিধানিক ও মানবাধিকারের ওপর আক্রমণ করা । আমাদের সংবিধানের ৩৯–এর (১) অনুচ্ছেদে চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা এবং বাকস্বাধীনতা একই মর্যাদায় উল্লেখ করা হয়েছে। ৩৯–এর (২) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, “সংবাদপত্রের” স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দান করা হল । তাই যখন কোনো পেশাজীবী সাধারণ নাগরিকের হয়ে সমাজ বা রাষ্ট্রনীতি, জনপ্রশাসন–সংক্রান্ত কর্মকাণ্ডের ভালো-মন্দ জনসমক্ষে তুলে ধরেন, তাঁরা নাগরিকের সেই অধিকারের চর্চাকেই বজায় রাখার চেষ্টা করেন ।

যাঁরা রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বপ্রাপ্ত হন, তাঁদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার দায় বহন করেন । কেননা আমাদের সংবিধান ঘোষণা করেছে যে এই দেশের সকল ক্ষমতার মালিক এ দেশের জনগণ এবং সরকারি কর্মকর্তারা সেই ক্ষমতা প্রয়োগ করার অধিকার পান শুধু জনগণের পক্ষে, নিজ স্বার্থে নয় । সেটাই বিবেকের কথা । সে কথা আমাদের যাঁরা স্মরণ করিয়ে দেন, তাঁদের বন্দী শালায় থাকা মানে আমাদের বিবেক আজ বন্দীশালায়